ফেসবুক প্রোফাইল লক: যেটা আপনি করেন, আর যেটা ফেসবুক আপনার সঙ্গে করে
বাংলায় "আইডি লক" বলতে বেশিরভাগ সময় বোঝায় ফেসবুক আপনাকে আটকে দিয়েছে। আর "প্রোফাইল লক" হলো তার উল্টোটা, নিজের হাতে গোপনীয়তা বাড়ানো। দুটো এক নয়।
Michael Chenবাংলায় ফেসবুক নিয়ে "লক" শব্দটা দুটো একেবারে বিপরীত জিনিস বোঝাতে ব্যবহার হয়, আর এই গোলমালটার কারণেই বেশিরভাগ মানুষ ভুল লেখাটা পড়ে ফেলেন।
খোঁজার তালিকা দেখলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়। "ফেসবুক আইডি লক" লিখলে যা আসে তার বেশিরভাগই হলো লক খোলার নিয়ম, লক হলে করণীয়, লক হয় কেন, লক হয়ে গেলে কিভাবে ফিরিয়ে আনবো। অর্থাৎ ওখানে মানুষ বলছেন ফেসবুক তাঁকে আটকে দিয়েছে।
এই লেখাটা সেটা নিয়ে নয়। এটা উল্টো জিনিসটা নিয়ে, যেটা আপনি নিজে চালু করেন।
দুটো লক, দুই দিকের
প্রথমটা হলো ফেসবুকের করা লক। আপনি ঢুকতে গেলেন, আর পর্দায় এলো ছবি পাঠান, বা পরিচয়পত্র দিন, বা আপাতত এই আইডি ব্যবহার করা যাবে না। এটা একটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এটা আপনি চালু করেননি, আর নিজের ইচ্ছেয় বন্ধও করতে পারবেন না। এখান থেকে বেরোনোর পথ একটাই, ফেসবুক যা চাইছে সেটা দেওয়া আর অপেক্ষা করা।
দ্বিতীয়টা হলো প্রোফাইল লক। এটা একটা গোপনীয়তার সুইচ। আপনি নিজে চালু করেন, নিজেই বন্ধ করেন, আর আপনার ঢোকা বা ব্যবহারে কোনো বাধা আসে না। আপনার আইডি পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকে, শুধু অচেনা মানুষ আপনার পাতায় গিয়ে অনেক কম জিনিস দেখতে পান।
একটা কথা এখানেই বলে রাখা দরকার, কারণ এটা নিয়ে অনেকের ধারণা ভুল। প্রোফাইল লক করা মানে আইডি বন্ধ করা নয়, ডিলিট করাও নয়, আর কিছুদিনের জন্য নিষ্ক্রিয় করাও নয়। আপনার সব কিছু আগের মতোই থাকে, বার্তা আসে, বিজ্ঞপ্তি আসে, আপনি আগের মতোই সব করতে পারেন।
চালু করলে ঠিক কী ঢাকা পড়ে
এটাই আসল অংশ, কারণ বেশিরভাগ লেখা এখানে অস্পষ্ট থাকে আর মানুষ ভাবেন সব ঢেকে গেছে।
যাঁরা আপনার বন্ধু তালিকায় নেই, তাঁদের জন্য যা বদলায়:
- আপনার পুরোনো পোস্টগুলো, যেগুলো আগে সবার জন্য খোলা ছিল, সেগুলো বন্ধুদের মধ্যে সীমিত হয়ে যায়।
- আপনার স্টোরি আর বন্ধু তালিকার বাইরে যান না।
- প্রোফাইলের পরিচয় অংশের বেশিরভাগটা ঢেকে যায়। বাইরের কেউ শুধু খুব সামান্য কিছু দেখতে পান।
- বড় ছবির বদলে ছোট আকারে দেখানো হয়, আর ভেতরে ঢুকে দেখার সুযোগ থাকে না।
আর এটা কোনো নতুন ব্যবস্থা নয়। প্রোফাইল লক আসলে অনেকগুলো আলাদা আলাদা গোপনীয়তার সেটিংস একসঙ্গে বদলে দেওয়ার একটা শর্টকাট। আপনি চাইলে ওই সেটিংসগুলো এক এক করে নিজেও বদলাতে পারতেন। লক শুধু কাজটা এক চাপে করে দেয়।
লক করার পরেও যা দেখা যায়
"লক করা আইডি কিভাবে দেখা যায়" এই প্রশ্নটা বাংলায় নিয়মিত খোঁজা হয়, আর তার উত্তরটা দুই দিক থেকেই কাজে লাগে। যিনি নিজের প্রোফাইল লক করেছেন তাঁরও জানা দরকার কতটা ঢাকল আর কতটা ঢাকল না।
লক করার পরেও বাইরের একজন মানুষ এগুলো দেখতে পান। আপনার নাম। আপনার বর্তমান প্রোফাইল ছবি আর কভার ছবি, ছোট আকারে হলেও। আপনার বন্ধু সংখ্যা নয়, কিন্তু আপনার সঙ্গে তাঁর মিল থাকা বন্ধুদের নাম। আর আপনি যদি কোনো খোলা গ্রুপে বা কোনো পেজের পোস্টে মন্তব্য করেন, সেই মন্তব্য ওখানে সবাই দেখতে পাবেন, কারণ ওই জায়গাটা আপনার প্রোফাইল নয়।
এই শেষ কথাটা সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝা হয়। প্রোফাইল লক আপনার নিজের পাতাটাকে ঢাকে। আপনি যা অন্যের পাতায় গিয়ে লিখে আসেন, সেটা অন্যের পাতার নিয়মে চলে, আপনার নিয়মে নয়।
অপশনটাই দেখাচ্ছে না, তখন
"প্রোফাইল লক হচ্ছে না কেন" নিয়মিত খোঁজা হয়, আর কারণটা সাধারণত আপনার কোনো ভুল নয়।
প্রোফাইল লক সব দেশে আর সব ধরনের আইডিতে একইভাবে আসেনি। এটা একটা আঞ্চলিকভাবে ছাড়া সুবিধা, আর ফেসবুক এটা সময়ে সময়ে বদলায়। তাই তিনটে কারণে মেনুতে জিনিসটা না থাকতে পারে। আপনার আইডির অঞ্চলে এটা চালু নেই। আপনার অ্যাপটা পুরোনো। অথবা আপনি যেটা লক করতে চাইছেন সেটা আসলে একটা পেজ, আর পেজে এই সুবিধা নেই, পেজের গোপনীয়তা আলাদা নিয়মে চলে।
অ্যাপ হালনাগাদ করে দেখুন, আর কম্পিউটারের ব্রাউজার থেকেও একবার দেখুন, কারণ দুই জায়গায় মেনু সবসময় এক রকম থাকে না। এরপরেও না এলে জোর করে আনার কোনো উপায় নেই। তখন হাতে যেটা আছে সেটা হলো এক এক করে গোপনীয়তার সেটিংস বদলে নেওয়া, যেটা একটু সময় নেয় কিন্তু ফল প্রায় একই।
প্রোফাইল ছবি নিয়ে সোজা কথা
এখানে একটা প্রতিশ্রুতি প্রায়ই দেওয়া হয় যেটা রাখা যায় না, তাই স্পষ্ট করে বলা দরকার।
আপনার এই মুহূর্তের প্রোফাইল ছবিটা প্রোফাইলে দেখা যাবেই। ওটাকে অদৃশ্য করার কোনো সেটিং নেই। ছবিটার দর্শক বদলে দিলে যেটা হয়, সেটা হলো ছবিটা যখন একটা পোস্ট হিসেবে আপনার টাইমলাইনে বসেছিল, ওই পোস্টটা ঢাকা পড়ে। কিন্তু গোল ছবিটা প্রোফাইলের মাথায় থেকেই যায়।
যেটা সত্যিই করা যায় সেটা হলো ছবির উপর একটা সুরক্ষা বসিয়ে দেওয়া, যাতে অন্য কেউ ওটা নামিয়ে নিতে বা স্ক্রিনশট নিতে না পারে আর ওটার উপর নীল রেখা বসে যায়। এটাও সব দেশে সবার জন্য নেই। আর এটাও ছবিটা লুকোয় না, শুধু তুলে নেওয়া কঠিন করে।
তাই যদি লক্ষ্য হয় কেউ যেন আপনার মুখ না দেখে, তাহলে একমাত্র নিশ্চিত পথ হলো প্রোফাইল ছবিতে নিজের মুখ না রাখা। এটা শুনতে রুক্ষ, কিন্তু এটাই কাজ করে।
লক করার আগে যেটা ভেবে নেবেন
প্রোফাইল লক করার একটা দাম আছে, আর সেটা লুকোনোর দরকার নেই।
আপনার পোস্ট বন্ধুদের বাইরে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। মানে অচেনা মানুষের কাছ থেকে আসা সাড়া কমে যাবে, আর নতুন মানুষের আপনাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। যিনি শুধু পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, তাঁর কিছুই হারায় না। কিন্তু যিনি ফেসবুক দিয়ে নতুন মানুষের কাছে পৌঁছাতে চান বা কিছু বিক্রি করেন, তাঁর জন্য এটা সরাসরি ক্ষতি।
এখানে একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার, কারণ এই পরামর্শটা প্রায়ই ভুলভাবে দেওয়া হয়। লক করার পরে সাড়া কমে গেলে বাইরে থেকে লাইক বা সাড়া কিনে সেটা পুষিয়ে নেওয়া যায় না। কারণ দুটো। এক, লক করা অবস্থায় আপনার পোস্ট বন্ধুদের বাইরে যাচ্ছেই না, তাই বাইরের সাড়ার জায়গাটাই বন্ধ। দুই, কেনা সংখ্যা আর সত্যিকারের নাগাল এক জিনিস নয়, আর প্রথমটা দ্বিতীয়টাকে ফিরিয়ে আনে না।
তাই সিদ্ধান্তটা সরল। গোপনীয়তা আর নাগাল, এই দুটোর মধ্যে একটা বেছে নিতে হয়। দুটো একসঙ্গে পাওয়ার কোনো সেটিং নেই। যদি গোপনীয়তা বেশি দরকার হয় তাহলে লক করুন, আর নাগাল কমবে জেনেই করুন। আর যেকোনো দিন মেনু থেকে আবার খুলে দেওয়া যায়, তাতে পুরোনো পোস্টের দর্শক আপনাআপনি আগের অবস্থায় ফেরে না, সেগুলো আলাদা করে দেখে নিতে হয়।

